১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক মহলে বিভিন্ন ঘটনা ঘটে, যা মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া, এবং মুক্তিবাহিনীর সাহসী অভিযান এই দিনের ঘটনাপ্রবাহকে ঐতিহাসিক করে তুলেছে। নিম্নে এই দিনের বিভিন্ন ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হলো।
২৮ আগস্ট ১৯৭১ সুইডেনে অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাসে নিরাপত্তা বিভাগে নিযুক্ত একমাত্র বাঙালি কর্মচারী মহাম্মদ শফিউল্লাহ পাকিস্তানের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দূতাবাসের চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সুইডেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন। স্টকহোমে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “দূতাবাসে আমিই একমাত্র বাঙালি। দেশের এই অবস্থায় যারা নিজের ভাইদের ওপর এমন বর্বর আচরণ করতে পারে, নির্মমতা ছাড়িয়ে যেতে পারে, গোটা বাংলাদেশকে শ্মশানে পরিণত করতে পারে, তাদের সঙ্গে আমরা আর এক থাকতে পারি না। আমরা এখন সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন একটি দেশ। আমাদের বিষয়টি কেবল আমরাই ভেবে দেখব।” এই পদক্ষেপ বাঙালি জাতির স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বব্যাপী সমর্থন ও সংহতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
গোলাম আযমের বক্তব্য: এই দিনে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম পাকিস্তানি শাসনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, “শ্লোগান আওড়িয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবিলা করা যাবে না। আপনারা সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করুন। অতিসত্বর রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিন। শান্তি কমিটিতে নিবন্ধন করুন।” এই বক্তব্য পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় সহযোগীদের সম্পৃক্ততার একটি প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থা: রাওয়ালপিন্ডিতে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহি জানান, “গত ২১ আগস্ট আমার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের দেখা হয়েছে। তিনি সুস্থ আছেন। লায়ালপুর কারাগারে তাকে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে।” এই বক্তব্য বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তথ্য পৌঁছে দেয়।
ভারতে ঘটনা:
১. মার্কিন সিনেটর চার্লস পার্সির বক্তব্য: ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংয়ের সঙ্গে দিল্লিতে সাক্ষাতের পর মার্কিন রিপাবলিকান দলের সিনেটর চার্লস পার্সি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “মার্কিন সরকারের উচিত পাকিস্তানকে কোনো ধরনের সমরাস্ত্র সহায়তা না দেওয়া এবং পাকিস্তানকে আর প্রশ্রয় না দেওয়া। এর ফলে ভারতের মতো দেশের বন্ধুত্ব আমরা হারাতে পারি। যারা আমাদের পুরনো পরীক্ষিত বন্ধু। একই সঙ্গে জাতিসংঘেরও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। পাকিস্তান যে ধরনের আচরণ করছে তা চরম অগ্রহণযোগ্য। তাদেরকে সহায়তা করা মানে এই অঞ্চলে একদিকে চরম বিপর্যয় ডেকে আনা, অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকেও জড়িয়ে ফেলা।”
২. পিটার শোরের বক্তব্য: কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী ও লেবার পার্টির নেতা পিটার শোর বলেন, “পূর্ব বাংলার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান। যে রাজনৈতিক সমাধান আসতে পারে উপযুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশের মাধ্যমে। আর এ জন্য জাতিসংঘকেই এগিয়ে আসতে হবে। ইতোমধ্যে গোটা বিশ্ব সজাগ হয়েছে অসহায় মানুষের জন্য। গোটা বিশ্বে মানুষ যেভাবে মানবতার জন্য দাঁড়িয়েছে তা অবিস্মরণীয়। সুতরাং কাজটি জাতিসংঘের জন্যও সহজ হবে। ব্রিটিশ সরকারও চায় পূর্ববঙ্গে স্থায়ী একটি রাজনৈতিক সমাধান আসুক। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা নিজ গৃহে ফিরে যাক।”
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অন্যান্য ঘটনা
১. মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ও চেস্টার বোন্সের বিবৃতি: মার্কিন সিনেটের শরণার্থী বিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান এডওয়ার্ড কেনেডি এবং ভারতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত চেস্টার বোন্স এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচারে দণ্ড প্রদান করা হলে পাকিস্তানকে সব ধরনের মার্কিন সহায়তা বন্ধ করতে হবে। শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার সম্পূর্ণরূপে অবৈধ।” তারা এই দিন শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য একটি প্রচার অভিযান শুরু করার ঘোষণা দেন।
২. ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য: ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জোসেফ গডবার প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদ্য খোলা বাংলাদেশ মিশনকে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “ব্রিটিশ সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কখনোই এই দূতাবাসের স্বীকৃতি দেবে না।”
৩. আবু সাঈদ চৌধুরীর ঘটনা: প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করায় পাকিস্তান সরকারের আবেদনে আবু সাঈদ চৌধুরীর জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সদস্যপদ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মনোনীত হন।
৪. জর্জ ডব্লিউ বুশের উদ্যোগ: জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি জর্জ ডব্লিউ বুশ জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্টের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এ সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন সাহায্য সমন্বয়ের জন্য মার্কিন সরকারের উদ্যোগে একটি ‘মার্কিন টাস্ক ফোর্স’ গঠনের ঘোষণা দেন।
২৮ আগস্ট ১৯৭১ মুক্তিবাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা করে। নিম্নে এই দিনের উল্লেখযোগ্য অভিযান ও ঘটনাগুলো তুলে ধরা হলো:
নওগাঁর পশ্চিমে আত্রাই নদী তীরবর্তী মান্দা এলাকার পাকুরিয়া গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই দিন সকালে প্রবেশ করে। তারা রাজাকারদের মাধ্যমে একটি মিটিংয়ের কথা বলে গ্রামবাসীদের স্থানীয় স্কুল মাঠে জড়ো করে। এরপর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে প্রায় ৩৫০ জন গ্রামবাসীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। বয়োবৃদ্ধ ও শিশু-কিশোরদের ছেড়ে দেওয়ার পর বাকিদের আটকে রেখে পার্শ্ববর্তী বাঁশঝাড় থেকে চিকন কঞ্চি এনে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করে। অতঃপর সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে ১২৮ জনকে হত্যা করে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কয়েকদিনের মধ্যে শহীদ হন। এই গণহত্যা পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার একটি জঘন্য নিদর্শন হিসেবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে।
১. সিলেটে মুক্ত এলাকা প্রতিষ্ঠা: মুক্তিবাহিনী সিলেটের জগন্নাথপুর থানার দিরাই ও শাল্লা এলাকা হানাদারমুক্ত করে। এই দুই অঞ্চলে মুক্তিবাহিনীর শাসনব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ক্যাপ্টেন সালেহ চৌধুরীকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
২. কুমিল্লায় নৌকা ডুবি: কুমিল্লার ময়ানপুরে ৫০ জন পাকিস্তানি হানাদার সৈন্যবাহী তিনটি নৌকা পশ্চিম দিক থেকে নয়ানপুরের দিকে যাওয়ার পথে মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল তিনটি নৌকাকেই ডুবিয়ে দেয়। এতে নৌকায় থাকা সব হানাদার সৈন্য পানিতে ডুবে মারা যায়।
৩. ব্রাহ্মণপাড়ায় অ্যামবুশ: কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থেকে শালদা নদী দিয়ে পাঁচটি নৌকায় অগ্রসর হওয়ার পথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনী অ্যামবুশ করে। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর পাঁচটি নৌকা ডুবে যায় এবং একজন ক্যাপ্টেনসহ ৩০ জন হানাদার সেনা নিহত হয়। ফলে নদীপথে পাকিস্তানি বাহিনীর যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়।
৪. মাধবপুরে অতর্কিত হামলা: ২ নম্বর সেক্টরে ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘এ’ কোম্পানির অধীনে মুক্তিবাহিনীর একটি টহলদার দল মাধবপুর গ্রামের বাইরে কাঁচা রাস্তায় অতর্কিত আক্রমণের জন্য ওঁত পেতে থাকে। বেলা ১১টার দিকে পাকিস্তানি হানাদারদের একটি জীপ ও একটি ট্রাক মুক্তিবাহিনীর সীমানায় ঢুকলে অতর্কিত হামলায় বেশ কয়েকজন হানাদার সৈন্য নিহত ও ছয়জন আহত হয়।
৫. চট্টগ্রামে রেল ট্র্যাকে মাইন বিস্ফোরণ: চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের কাছে মুক্তিযোদ্ধা নিজামের নেতৃত্বে একটি রেলওয়ে ট্র্যাকে মাইন স্থাপন করা হয়। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে হানাদার সৈন্য ও রাজাকারবাহী একটি ট্রেন বিস্ফোরণে পড়লে বেশ কয়েকজন হানাদার সেনা ও রাজাকার নিহত ও আহত হয়।
৬. হাজীগঞ্জে অ্যামবুশ: চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের হাসনাবাদে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১০-১২টি নৌকায় আসার সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহিরুল হক পাঠানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর অ্যামবুশে পড়ে। এতে মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন শহীদ হন এবং ১০ জন হানাদার সেনা নিহত হয়।
৭. নোয়াখালীতে অভিযান: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ থেকে মহেশপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের একটি দল আসার খবরে মুক্তিবাহিনী গ্রামটি ঘিরে ফেলে। এতে চারজন হানাদার সেনা নিহত হয় এবং বাকিরা পালিয়ে যায়।
৮. খুলনায় থানা অবরোধ: খুলনার আশাশুনি থানায় মুক্তিবাহিনীর একটি গেরিলা দল টানা দুই রাত অবরোধ করে। দ্বিতীয় দিন রাতে সাতক্ষীরা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও নৌবাহিনী আক্রমণ চালালে ১৪ ঘণ্টার যুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, দুজন বন্দী হন, এবং তিনজন মিলিশিয়া ও ১৬ জন রাজাকার নিহত হয়।
৯. ফরিদগঞ্জে হামলা: চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের রাওয়াল গ্রামে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দল অতর্কিত হামলায় বেশ কয়েকজন হানাদার সৈন্য নিহত ও ১০ জন আহত হয়। এতে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
১০. শাহবাজপুরে আক্রমণ: সিলেটের শাহবাজপুর রেলস্টেশন ঘাঁটি থেকে তাজপুরের দিকে অগ্রসর হওয়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর মুক্তিবাহিনী আক্রমণ চালায়। এতে চারজন রাজাকারসহ একজন হানাদার সৈন্য নিহত ও কয়েকজন আহত হয়।
১১. দিনাজপুরে অভিযান: দিনাজপুরে ক্যাপ্টেন দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী অমরখানা অবস্থানে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত এবং বেশ কয়েকজন হানাদার সৈন্য হতাহত হয়।
১২. মাইজবারে হামলা: কুমিল্লার মাইজবার গ্রামে মুক্তিবাহিনী অতর্কিত হামলায় প্রায় ৩৬ জন হানাদার সেনা নিহত হয়।
সূত্র:
মন্তব্য করুন