ঢাকা সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন

এস এ অরণ্য
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬, ১০:১০ পিএম
যশোরে ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের সময় এমপিএ মোশাররফ হোসেন, তার কন্যা এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের অংশগ্রহণে 'জয় বাংলা' ব্যানার বহনকারী মিছিল। মশিউর রহমান এমএনএ, রবিউল আলম, আব্দুল হাই, মশিয়র রহমান অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘যদি আমরা নিজেদের প্রথমত বাঙালি, পাঞ্জাবি ও সিন্ধি ভাবতে শুরু করি এবং শুধুই ঘটনাচক্রে নিজেদের মুসলমান ও পাকিস্তানি ভাবি, সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান ভেঙে যাওয়া অনিবার্য।’

২৩ বছর পর জিন্নাহর সেই আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়; পাকিস্তান ভেঙে ১৯৭১ সালে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

১৯৭১-এর ১ মার্চ বাঙালি জাতি তার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে ও নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত এই কার্যকর অসহযোগ আন্দোলন ছিল বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

এ অসহযোগ আন্দোলনে হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে শুরু করে বেসামরিক প্রশাসনের কর্মচারী, আধাসামরিক বাহিনী থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত সবাই সক্রিয় সমর্থন জানিয়ে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি নিজেদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক ক্ষমতাসীন না হয়েও অসহযোগের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দায়িত্ব স্বহস্তে নিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সরকারবিহীন স্বাধীন প্রশাসনযন্ত্র সুষ্ঠুভাবে কাজ করে ২৫ মার্চ পর্যন্ত।

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বাঙালি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য ক্ষণ গুনছিল, তখন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান আকস্মিক জাতীয় পরিষদের ৩ মার্চের নির্ধারিত অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন।

ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ফুঁসে ওঠে বাংলাদেশ। বিক্ষোভে উত্তাল হয় রাজপথ। ছাত্ররা স্লোগান দেয়, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। পহেলা মার্চ দুপুর থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও রণাঙ্গনের সাংবাদিক হারুন হাবীব তাঁর পহেলা মার্চের ঘটনা ডায়েরির পাতায় তুলে ধরেছেন এভাবে, ‘এমসিসি ক্রিকেট দলের খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে ঢুকতে যাচ্ছি। হঠাৎ ভেতর থেকে হাজার হাজার মানুষ স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে এলো।

ইয়াহিয়া খান বেতারে ঘোষণা দিয়েছে ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে না। বুঝতে পারছি, আমাদের আসলে যুদ্ধ করতে হবে। স্লোগান দিয়ে লাভ নেই। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। কেন ক্ষমতা দেবে না পাঞ্জাবিরা? শেখ মুজিবের উচিত পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা। মহসীন হলের ১০৭ নম্বর রুমে আমি ও আব্দুল হালিম অনেক রাত পর্যন্ত এ নিয়ে অনেক কথা বললাম। যাচ্ছে কোথায় দেশটা?’ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মৃতিচারণাতেও সেই দোলাচল ধরা পড়ে।

তিনি ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে এ দিনের রোজনামচায় লিখেছেন: ‘...শেখ মুজিব আগামীকাল ঢাকা শহরে, আর পরশুদিন সারাদেশে হরতাল ডেকেছেন। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজমায়েতের ঘোষণাও দিয়েছেন। জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের কী পরিণাম হতে পারে, তা নিয়ে বহু রাত পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা চলল খাবার টেবিলে বসে। রাত প্রায় বারোটার দিকে শুতে গিয়েও ঘুম এলো না। অনেক দূর থেকে স্লোগানের শব্দ আসছে।...কেবল জয় বাংলা ছাড়া অন্য স্লোগানের কথা ঠিক বোঝা যায় না। কিন্তু তবু এ সম্মিলিত শতকণ্ঠের গর্জন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে এসে পড়েছে শ্রুতির কিনারে।’

হারুন হাবীব ও জাহানারা ইমামের মতো সারাদেশের মানুষ আশা-নিরাশা এবং আশঙ্কা ও সম্ভাবনার দোলাচলে দুলছিল। সচেতন তরুণরা মনে মনে তৈরি হচ্ছিল কঠিন সংগ্রামের সংকল্প গ্রহণে। মানুষের মনে যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানুষের মনের সেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধতা আঁচ করতে পেরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ ও ৩ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানে সর্বাত্মক হরতাল পালনের ঘোষণা দেন এবং ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার ঘোষণা দেন। সেই শুরু।

একে একে পেরিয়ে আসে বিক্ষুব্ধ ২৫টি দিন। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর আক্রমণ চালায়; শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। এরই পথ ধরে ৯ মাসে আমরা পাই একটি স্বাধীন দেশ—বাংলাদেশ।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নীতি-ভুলের খেসারত / মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৩০ লাখ শিশু, ফিরছে নির্মূল হওয়া রোগ

১৯ এপ্রিল ১৯৭১: প্রবাসী সরকারের শাসনতান্ত্রিক নির্দেশনা ও রণক্ষেত্রে রক্তের দাগ

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

১৭ এপ্রিল ১৯৭১: স্বাধীন বাংলাদেশের সূর্যোদয় ও মুজিবনগর সরকার

মুজিবনগর দিবস: এক অমর ইতিহাসের মহাকাব্য

১৬ এপ্রিল ১৯৭১: শপথের প্রতীক্ষা ও রণক্ষেত্রের আর্তনাদ

মুজিবনগর ও আমাদের প্রথম সাংবিধানিক পরিচয়

১২ এপ্রিল ১৯৭১: সরকারের পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ও বালারখাইলের রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম ভাষণ

১০

১১ এপ্রিল ১৯৭১: তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ ও সংগঠিত প্রতিরোধের সূচনা

১১

১০ এপ্রিল ১৯৭১: বাংলাদেশের প্রথম সরকার ও স্বাধীনতার সনদ

১২

১০ এপ্রিল ১৯৭১: যখন যুদ্ধের অন্ধকারে জন্ম নেয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আইনি সূর্য

১৩

০৫ এপ্রিল ১৯৭১: বহুমুখী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

১৪

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১৫

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১৬

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

১৭

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

১৮

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

১৯

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২০