

১৯৭১ সালের ২১ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২১তম দিন। সারা দেশে তখন এক অভূতপূর্ব অচলাবস্থা। একদিকে আলোচনার টেবিলে চলছে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা, অন্যদিকে রাজপথে বাঙালির দ্রোহ আর সেনানিবাসে পাকিস্তানি জান্তার যুদ্ধের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অত্যন্ত জটিল দিন ছিল এটি।
মুজিব-ইয়াহিয়া পঞ্চম দফা বৈঠক ও বঙ্গবন্ধুর কঠোর অবস্থান
এদিন সকালে প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাজউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ৭০ থেকে ৯০ মিনিটের এক অনির্ধারিত বৈঠকে বসেন। এটি ছিল তাঁদের পঞ্চম দফা বৈঠক। বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বিস্তারিত কিছু না জানালেও তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। বিকেলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে সমবেত জনতার উদ্দেশে তিনি ঘোষণা করেন:
"বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ অহিংস অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। নীতির প্রশ্নে কোনোই আপস নাই।"
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বুলেট বা বেয়োনেট দিয়ে বাঙালির এই জাগরণ স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। চরম ত্যাগের জন্য তিনি দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
ভুট্টোর ঢাকা আগমন ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক
কঠোর সামরিক প্রহরায় ১২ জন উপদেষ্টাসহ এদিন ঢাকা আসেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো। বিমানবন্দর থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (বর্তমানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা) যাওয়ার পথে তিনি বাঙালিদের তীব্র বিক্ষোভ ও তোপের মুখে পড়েন।
হোটেল কর্মচারীদের বিদ্রোহ: হোটেলের বাঙালি কর্মচারীরা কালো ব্যাজ ও বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা খুলে ফেলতে অস্বীকার করেন এবং প্রয়োজনে পাকিস্তানি সেনাদের ‘ভাত-পানি’ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
ইয়াহিয়া-ভুট্টো বৈঠক: সন্ধ্যায় ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ভবনে গিয়ে ইয়াহিয়ার সঙ্গে দুই ঘণ্টার বেশি সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, আওয়ামী লীগের ৬-দফার ভিত্তিতে কোনো সমঝোতা তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
রাজপথের কর্মসূচি ও ‘প্রতিরোধ দিবস’ এর ডাক
প্রতিরোধ দিবস: কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চকে ‘পাকিস্তান দিবস’-এর পরিবর্তে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়।
পণ্য বর্জন: স্বাধীন বাংলাদেশ শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চ থেকে ‘পশ্চিম পাকিস্তানি পণ্য বর্জন সপ্তাহ’ পালনের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
মগবাজারের নারী সমাবেশ: মগবাজারে এক নারী সমাবেশে প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি ‘প্যারা-মিলিটারি’ বাহিনী গঠনের জোরালো আহ্বান জানানো হয়।
ভাসানীর ঘোষণা: চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসভায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঘোষণা করেন যে, আলোচনার মাধ্যমে কোনো ফল আসবে না। তিনি অবিলম্বে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।
পর্দার আড়ালে যুদ্ধের প্রস্তুতি
যখন আলোচনার টেবিলে কালক্ষেপণ করা হচ্ছিল, তখন ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁর সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে যুদ্ধের নীল নকশা চূড়ান্ত করছিলেন।
সৈন্য ও অস্ত্র বৃদ্ধি: পিআইএ-র বোয়িং ৭০৭ বিমানে করে প্রতিদিন ১৬-১৭টি ফ্লাইটে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নিয়মিত সৈন্য ও গোলাবারুদ ঢাকায় আনা হচ্ছিল। চট্টগ্রাম বন্দরেও অস্ত্রবাহী জাহাজ ভিড়ছিল।
ব্রিটিশ সহায়তা: ব্রিটিশ সরকার এদিন পাকিস্তানি বিমান ও জাহাজকে মালদ্বীপের ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়, যা রসদ সরবরাহে পাকিস্তানকে সহায়তা করে।
গাজীপুরে কারফিউ: ১৯ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধের পর গাজীপুরে জারি করা কারফিউ এদিন মাত্র ৬ ঘণ্টার জন্য শিথিল করা হয়েছিল, যা সন্ধ্যা ৬টা থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য জারি করা হয়।
তথ্যসূত্র
দৈনিক ইত্তেফাক (২২ মার্চ, ১৯৭১)।
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী রচিত ‘৭১ এর দশ মাস’।
আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক রচিত নিবন্ধ।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাতীয় ই-তথ্যকোষ।
তৎকালীন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও স্থানীয় আর্কাইভ।
মন্তব্য করুন