

১৯৭১ সালের ২০ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২০তম দিন। এদিন একদিকে যেমন ঢাকা ও সারা দেশ মুক্তিপাগল মানুষের মিছিলে উত্তাল ছিল, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চূড়ান্ত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ঐতিহাসিক এই দিনের ঘটনাক্রম ছিল নিম্নরূপ:
মুজিব-ইয়াহিয়া চতুর্থ দফা বৈঠক
২০ মার্চ সকালে ঢাকার রমনা প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে চতুর্থ দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ছয় জন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন:
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
তাজউদ্দীন আহমদ
এ এইচ এম কামরুজ্জামান
এম মনসুর আলী
খন্দকার মোশতাক আহমদ
ড. কামাল হোসেন
বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের জানান, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে বিস্তারিত জানাতে অপরাগতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, "সময় এলে আমি সব বলব।" এদিন তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনেও তিনি পুনরায় আন্দোলনের সংকল্প ব্যক্ত করেন।
‘অপারেশন সার্চলাইট’ ও গণহত্যার অনুমোদন
আলোচনার টেবিলে যখন অগ্রগতির কথা বলা হচ্ছিল, ঠিক তখনই ঢাকা সেনানিবাসে জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁর সামরিক উপদেষ্টাদের নিয়ে এক গোপন ও জরুরি বৈঠকে বসেন। তৎকালীন মেজর সিদ্দিক সালিকের ভাষ্যমতে, এই বৈঠকে জেনারেল হামিদ খান, টিক্কা খান, জেনারেল পীরজাদা এবং জেনারেল ওমরের উপস্থিতিতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
এরই অংশ হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পিআইএ ফ্লাইটে করে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সৈন্য ও রসদ ঢাকায় আনা হতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলনের শুরুতে যেখানে এক ডিভিশন সৈন্য ছিল, ২০ মার্চের মধ্যে তা দুই ডিভিশনে উন্নীত করা হয়।
রাজপথের আন্দোলন ও সংহতি
অসহযোগ আন্দোলনের এই দিনেও সারা দেশের বাড়িঘর ও অফিস-আদালতে কালো পতাকা উড়ছিল। ঢাকাসহ সারা দেশে মিছিলের পর মিছিল এগিয়ে চলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে।
সাবেক নৌসেনাদের সমাবেশ: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাবেক নৌসেনারা এক সমাবেশে মিলিত হয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত মুক্তি সংগ্রামের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁরা সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে একটি সম্মিলিত ‘মুক্তিবাহিনী কমান্ড’ গঠনের আহ্বান জানান।
জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু: ৩২ নম্বরের বাসভবনে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেন, "মুক্তিপাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়কে পৃথিবীর কোনো শক্তিই রুখতে পারবে না।"
পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক তৎপরতা
করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, তিনি প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে ঢাকা আসছেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য নেতাদের ৬-দফা ভিত্তিক কোনো ‘লন্ডন পরিকল্পনা’ তিনি মেনে নেবেন না। একই দিনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রখ্যাত আইনজীবী এ. কে. ব্রোহি করাচি থেকে ঢাকায় আসেন।
মন্তব্য করুন