

১৯৭১ সালের ২২ মার্চ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের ২২তম দিন। এদিন ঢাকার রাজনৈতিক আকাশ ছিল একদিকে মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে চলছিল কুটিল ষড়যন্ত্র আর কালক্ষেপণের খেলা। ইতিহাসের পাতায় এই দিনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ও বঙ্গবন্ধুর কঠোর বার্তা
সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ভবনে এক ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো। প্রায় ৭৫ মিনিট স্থায়ী এই বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু যখন বেরিয়ে আসেন, তখন তাঁর অবয়ব ছিল দৃঢ় ও বিষণ্ণ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন:
"আমি প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি যে, আমাদের চার দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে পারি না।"
দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে ফিরে তিনি পুনরায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। আলোচনায় অগ্রগতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কিছুটা উচ্চকণ্ঠে বলেন, "অগ্রগতি না হলে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি কেন?" তবে তাঁর কথায় স্পষ্ট ছিল যে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবেই।
জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় স্থগিত
এদিন সন্ধ্যায় এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। স্থগিতের কারণ হিসেবে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘ঐকমত্যের পরিবেশ সম্প্রসারণের সুযোগ’ সৃষ্টির জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এটি ছিল মূলত বাঙালিদের দাবি মেনে না নেওয়ার এবং সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময়ক্ষেপণের একটি সুচিন্তিত চাল।
৩২ নম্বরে মিছিলের মহাসমুদ্র
এদিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে মিছিলের যে ঢল নেমেছিল, তা আগের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। সারা দিন কয়েকশ মিছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে এলাকা মুখরিত করে রাখে। জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বারবার বারান্দায় এসে ভাষণ দেন। তিনি ঘোষণা করেন:
“২৩ বছর মার খেয়েছি, আর মার খেতে রাজি নই। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।”
“সাত কোটি বাঙালি যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখন আমি অবশ্যই দাবি আদায় করে ছাড়ব।”
“বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে।”
‘বাংলাদেশের মুক্তি’ ও বিশেষ ক্রোড়পত্র
এদিন বঙ্গবন্ধু সকল সংবাদপত্রের জন্য ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ শিরোনামে একটি বিশেষ বাণী প্রদান করেন। তিনি বলেন, “আমাদের আন্দোলনের বৈধতার কারণে বিজয় এখন আমাদেরই।”
পাশাপাশি, ঢাকার প্রধান সংবাদপত্রগুলো (অবজারভার গ্রুপ বাদে) ‘বাংলার স্বাধিকার’ শিরোনামে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাণীসহ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ চৌধুরী এবং অধ্যাপক রেহমান সোবহানের প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ঐতিহাসিক ক্রোড়পত্রের পরিকল্পনায় ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার।
সাবেক সৈনিকদের শপথ ও উত্তাল দেশ
বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সাবেক বাঙালি সৈনিকরা এক বিশাল সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ করেন। তাঁরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নেন। অন্যদিকে, মিরপুর, চট্টগ্রাম ও সৈয়দপুরে বিহারি ও বাঙালিদের মধ্যে দাঙ্গা বাধানোর জন্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী উসকানি দিতে শুরু করে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী রচিত ‘৭১ এর দশ মাস’।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আর্কাইভ।
১৯৭১ সালে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক ও অন্যান্য সংবাদপত্র।
সিদ্দিক সালিক রচিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’।
মন্তব্য করুন