

১৯৭০ সালের নির্বাচনের নিরঙ্কুশ জনরায় যখন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নস্যাৎ করার চক্রান্তে লিপ্ত, ঠিক তখনই বাঙালির হৃদয়ে জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের দাবানল। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ যখন ইয়াহিয়া খান আকস্মিক ঘোষণায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন, তখন থেকেই শুরু হয় চূড়ান্ত অসহযোগ। সেই উত্তাল আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে লাখো ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা। আজ সেই ঐতিহাসিক ‘জাতীয় পতাকা দিবস’।
উত্তাল মার্চের প্রেক্ষাপট ও ইয়াহিয়ার ছক
১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভাবনীয় বিজয়ের পর পাকিস্তানের সামরিক জান্তা শঙ্কিত হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে—এই ভয়ে ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকেন।
৭১-এর জানুয়ারিতে ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার পর ইয়াহিয়া খান তাকে ‘পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যা দিলেও, আড়ালে লারকানায় ভুট্টোর বাসভবনে বসে চলত সামরিক নীল নকশা। ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শাসনতন্ত্র তৈরির বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অনড় অবস্থানের বিপরীতে ভুট্টো অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। ফলশ্রুতিতে ১ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে এক রেডিও ভাষণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন ইয়াহিয়া খান।
২ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র সমাবেশ
অধিবেশন স্থগিতের খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে। ২ মার্চ সকাল থেকেই ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। বেলা ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বটতলায় আয়োজন করা হয় এক বিশাল ছাত্র সমাবেশ।
ঐতিহাসিক সেই মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছিলেন ডাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব, জিএস আব্দুল কুদ্দুস মাখন এবং শাহজাহান সিরাজ। সমাবেশের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী। ঠিক সেই মুহূর্তে ছাত্রলীগ নেতা শেখ জাহিদ হোসেন একটি বাঁশের মাথায় বেঁধে নিয়ে আসেন সবুজ জমিনের মাঝে লাল বৃত্তের ওপর সোনালী মানচিত্রখচিত সেই কাঙ্ক্ষিত পতাকা।
হাজার হাজার মানুষের গগণবিদারী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে আ স ম আব্দুর রব প্রথম সেই পতাকা উত্তোলন করেন। তৎকালীন জিন্নাহ অ্যাভিনিউ (বর্তমান বায়তুল মোকাররম এলাকা) পর্যন্ত বিস্তৃত সেই বিশাল মিছিলের মাধ্যমেই স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তির বীজ রোপিত হয়েছিল।
পতাকার নেপথ্যে: নকশা ও পরিকল্পনা
পতাকাটি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পরিকল্পনা হয়েছিল ১৯৭০ সালের ৬ জুন ইকবাল হলের (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ১১৬ নম্বর কক্ষে। কাজী আরেফ আহমেদের প্রাথমিক প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি করে আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম, হাসানুল হক ইনুসহ ছাত্রনেতারা এই নকশা চূড়ান্ত করেন।
পতাকার কারিগরি রূপ দেন কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শিবনারায়ণ দাস। নিউমার্কেটের ‘অ্যাপোলো’ বা ‘নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্স’ থেকে সেলাই করা এই পতাকায় মানচিত্র আঁকার মূল উদ্দেশ্য ছিল যাতে পশ্চিম পাকিস্তান একে তাদের ভূখণ্ড দাবি করতে না পারে। ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে এই পতাকা প্রথম বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
কারফিউ বনাম বিদ্রোহের রাজপথ
২ মার্চ দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাতে সচিবালয় থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সামরিক সরকার রাতে ঢাকায় কারফিউ জারি করে। কিন্তু ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে সাধারণ মানুষ কারফিউ ভেঙে বেরিয়ে আসে। ডিআইটি মোড় ও মর্নিং নিউজ পত্রিকা অফিসের সামনে সেনাবাহিনী মিছিলের ওপর নির্বিচারে গুলি চালালে বহু মানুষ হতাহত হন।
স্বাধীনতার ইশতেহার ও পরবর্তী ধাপ
২ মার্চের এই সফল পতাকা উত্তোলনের পথ ধরেই ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতিতে শাহজাহান সিরাজ পাঠ করেন স্বাধীনতার ইশতেহার। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নিজ বাসভবনে এই পতাকা উত্তোলন করেন।
মন্তব্য করুন