

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল শুনানি আগামী ১৭ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে আজ সোমবার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগ এই আদেশ দেন।
পেপারবুক ও আপিল শুনানি
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী ও আইনজীবী মীর ওসমান বিন নাসিম। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
পরে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, আপিলকারী পক্ষ মামলার বৃত্তান্তসংবলিত 'পেপারবুক'-এর অনুলিপি আনুষ্ঠানিকভাবে সরবরাহ না করায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছিল। আদালত তা মঞ্জুর করে ১৭ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
আবুল কালাম আজাদের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিকী জানান, ট্রাইব্যুনালের ১৩ বছর আগের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে গত ৬ জুলাই বিলম্ব মার্জনাসহ আপিলটি দায়ের করা হয়। নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হওয়ার পর আপিল করায় আবেদনের সঙ্গে ৪ হাজার ৯১৫ দিনের বিলম্ব মার্জনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আপিল চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড স্থগিত ও খালাস চাওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর মক্কেলের মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত রয়েছে, যা আগামী অক্টোবরে শেষ হবে। ফলে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাজা স্থগিতের আবেদন জানানো হয়েছে।
আত্মসমর্পণ ও ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ
মৃত্যুদণ্ডাদেশের ১৩ বছর পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করতে হাজির হন আবুল কালাম আজাদ। সেদিন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ শুনানি শেষে তাঁকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের নির্দেশ দেন।
শুনানিকালে আজাদের আইনজীবী মো. মশিউল আলম জানান, তাঁর মক্কেলের বয়স এখন ৮০ বছর এবং তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত অসুস্থ। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁর সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করেছে। ট্রাইব্যুনাল শুরুতে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর মৌখিক নির্দেশ দিলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থগিতাদেশ ও সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আদেশ পুনর্বিবেচনা করেন। ট্রাইব্যুনাল নির্দেশ দেন যে, আপিল বিভাগ থেকে কোনো নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আবুল কালাম আজাদ ‘যেমন আছেন, তেমনই থাকবেন’ (অর্থাৎ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে না থেকে মুক্ত অবস্থায় থাকবেন)।
প্রথম যুদ্ধাপরাধ রায়ের পটভূমি
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয়। সেই বিচার শুরুর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এটিই ছিল প্রথম রায়। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আদালত আবুল কালাম আজাদকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে বিচার চলাকালে ও রায় ঘোষণার সময় তিনি পলাতক ছিলেন।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে সাতটি অভিযোগে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি চারটিতে কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হলেও মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর হওয়ার নিয়ম থাকায় আলাদা করে শাস্তি নির্ধারণ করা হয়নি। একটি অভিযোগ প্রমাণের অভাবে খারিজ করা হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আজাদের মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। এরপরই তাঁর দেশে ফেরার খবর আসে এবং পরবর্তীতে তিনি ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন।
মন্তব্য করুন