ঢাকা সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

পাল বংশের অবসান ও বাংলায় লুপ্তপ্রায় বৌদ্ধ ধর্ম

বাংলা ও ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটেছিল রাজা বিম্বিসার, অশোক, কণিষ্ক, হর্ষবর্ধন এবং পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বহু বিত্তশালী ব্যক্তির সহায়তায়।
আবু তাইয়্যেব
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
নালন্দা মহাবিহার

সাম্রাজ্যিক উত্থান-পতন এবং রাজরাজড়াদের বিবরণকেন্দ্রিক বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারায় পাল রাজবংশের নাটকীয় উত্থান, ক্রমান্বয়ে শিখরারোহণ এবং একপর্যায়ে সেন বংশ কর্তৃক ক্ষয়িষ্ণু পাল রাজন্যের সিংহাসনচ্যুতি অপরাপর রাজবংশের ইতিহাসের ন্যায় একটি স্বাভাবিক পরম্পরা। কিন্তু কার্যকারণনির্ভর ধর্মীয়-সামাজিক ইতিহাসচর্চায় বাংলার রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে পালদের অবসান আলাদাভাবে তাৎপর্যবহ। একনিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং পৃষ্ঠপোষক হিসেবে খ্যাত পাল বংশের পতনের মাধ্যমে বাংলার ধর্মবৈচিত্র্যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সূচনা হয় এবং তা হচ্ছে অঞ্চলের জনমানসে দীর্ঘকালব্যাপী প্রবল বেগে বয়ে চলা বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষরণ।

ধর্মমত হিসেবে বৌদ্ধিক ঐতিহ্য দর্শনের বাংলায় আগমন, প্রসার, রূপান্তর এবং ক্ষয় প্রভৃতি বিষয়াদির স্বরূপ এখনো ঐতিহাসিকভাবে বিবদমান। প্রাক- সাধারণ অব্দ ষষ্ঠ শতাব্দীতে নেপালের কপিলাবস্তুর লুম্বিনী গ্রামে ক্ষত্রিয় পরিবারে জন্মগ্রহণকারী সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের শিক্ষা জীবনদর্শনই ধম্ম বা বৌদ্ধ ধর্ম নামে পরিচিত। ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোরতা, জাতিভেদ প্রথা এবং যাগযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী জীবনদর্শন হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটে। পালি ভাষায় রচিত ত্রিপিটক (বিনয়পিটক, সুত্তপিটক অভিধম্মপিটক) অনুসারে ঈশ্বর-পরমাত্মা-পরকালে অনাস্থাজ্ঞাপন, অহিংসা চতুরার্যসত্য প্রচার, মানব দুর্দশার স্থায়ী পরিত্রাণ বা নির্বাণ প্রভৃতি হচ্ছে বুদ্ধের শিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্য। ভারতবর্ষে তখন নগরায়ণের দ্বিতীয় ধাপ চলছিল। গৌতম বুদ্ধ এবং তার অনুসারীদের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বুদ্ধ স্বয়ং বোধিলাভের (বিশেষ জ্ঞান) পর সারনাথ, মগধ, কোশল, বৈশালী, মধ্যদেশ, বারাণসী অর্থাৎ মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকা অঞ্চলে তার শিক্ষা প্রচার করেন। গৌতম বুদ্ধের নিম্ন গাঙ্গেয় -দ্বীপাঞ্চল বাংলা ভূখণ্ডে আগমনের কোনো তথ্য বিনয়পিটক বা সুত্তপিটক কিংবা পরবর্তীকালে রচিত সূত্রগুলোয় দৃষ্টিগোচর হয়নি। দিব্যাবদান সূত্রমতে, মধ্যদেশ রাজ্যের পূর্বসীমা পুণ্ড্রবর্ধন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মগধ অর্থাৎ বর্তমান বিহারের দক্ষিণাংশ ছিল বাংলার ঠিক পশ্চিমে অবস্থিত। আবার অঙ্গুত্তর নিকায় অনুসারে বুদ্ধ অঙ্গ রাজ্যের রাজধানী চম্পা বা চম্পক নগরীতে এসেছিলেন এবং তার উপদেশমালা প্রচার করেছেন, যা বাংলার পশ্চিম সীমান্তের নিকটবর্তী স্থান বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, গৌতম বুদ্ধ সরাসরি বাংলায় না হলেও বাংলার নিকটতম প্রান্ত অঞ্চলে আগমন করেছিলেন এবং সেখান থেকে পরবর্তীকালে তার অনুসারীদের মিশনারি কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসার সাধিত হয়।

মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্তির পূর্বে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাসের কোনো প্রমাণাদি আমাদের হাতে নেই। বগুড়ার মহাস্থানে প্রাপ্ত প্রাকৃত ভাষায় লিখিত প্রাক-সা. অব্দ তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের জারীকৃত অনুশাসন বা মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপি বাংলার উত্তরাঞ্চলে মৌর্য সাম্রাজ্যের উপস্থিতির মূল্যবান আকর সূত্র। এছাড়া উয়ারী-বটেশ্বর, তাম্রলিপ্তি, চন্দ্রকেতুগড় মহাস্থানগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে উত্তর ভারতীয় মসৃণ কৃষ্ণকায় মৃৎপাত্র (NBPW), বিশেষ চিহ্নসংবলিত ছাপাঙ্কিত মুদ্রা (Punch-Marked Coins) বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন বাংলায় মৌর্য সম্প্রসারণের প্রমাণ নির্দেশ করে। ধারণা করা হয়, অশোকের মাধ্যমে মৌর্য শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের বিকাশ সাধিত হয়। সা. অব্দ সপ্তম শতাব্দীর চৈনিক তীর্থযাত্রী জুয়ান জাং ভ্রমণ বিবরণী Datang Xiyu ji গ্রন্থে বাংলায় অশোক কর্তৃক নির্মিত স্তূপের উল্লেখ করেছেন। এর কিছুকাল পর আগত আরেক চৈনিক পরিব্রাজক -জিংয়ের বিবরণীতেও তাম্রলিপ্তি, কর্ণসুবর্ণ, পুণ্ড্রবর্ধন সমতটে অশোক নির্মিত বৌদ্ধস্তূপের উল্লেখ পাওয়া যায়। মৌর্য বংশের অবসানের পর বাংলার ইতিহাসের সীমিত কিছু উৎস থেকে শূঙ্গ কুষাণ বংশের নাম দেখতে পাওয়া যায়। শূঙ্গ বংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্ম সংঘের প্রতি তাদের বিরূপ মনোভাব প্রতীয়মান হলেও কুষাণদের সময় বিশেষত রাজা কণিষ্কের সময় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভূত অগ্রগতি সাধিত হয়, যার প্রমাণ মেলে প্রাপ্ত বিভিন্ন বুদ্ধমূর্তি, তাম্র স্বর্ণমুদ্রা এবং প্রত্নলিপি থেকে। গুপ্ত রাজারা ব্রাহ্মণ্যবাদের অনুসারী হলেও চৈনিক পরিব্রাজক ফাসিয়ানের বিবরণী, তাম্রশাসন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাদের ঔদার্য মনোভাব পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ মেলে। গুপ্তদের পর শশাঙ্কের শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং দমন-পীড়নের তথ্য পাওয়া যায় জুয়ান জাংয়ের ভ্রমণবৃত্তান্তে, যদিও তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। বাংলার প্রথম স্থানীয় বৌদ্ধ রাজবংশ হচ্ছে সমতটের খড়গ বংশের। ঢাকার অদূরে অবস্থিত আশরাফপুরে প্রাপ্ত দুটি, কুমিল্লার দেউলবাড়িতে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন এবং চৈনিক পরিব্রাজক শেং-চি প্রদত্ত তথ্য দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম সংঘের বিকাশে খড়গ রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার দলিল।

তবে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার এবং ধর্ম-সংস্কৃতিতে প্রভাব বৃদ্ধির চূড়ান্ত কার্য সম্পন্ন হয় পাল রাজাদের সময়ে। বৌদ্ধ উপাসক পাল রাজারা তাদের সুদীর্ঘ প্রায় ৪০০ বছরের শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানাদি, ভিক্ষু-শ্রমণ প্রভৃতিকে ভূমিদান এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মাধ্যমে অভূতপূর্ব বিকাশের পথকে সুগম করেছেন। পালদের আমলে প্রচুর পরিমাণে বৌদ্ধবিহার মঠ নির্মিত হয় এবং ভারতবর্ষেও প্রধান বৌদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে বাংলা অঞ্চল পরিচিতি পায়। শুধু তাই নয়, বৌদ্ধ ধর্মের আন্তর্জাতিকীকরণও সময়ে সম্পন্ন হয়। চীন, শ্রীলংকাসহ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়ার বৌদ্ধ ধর্মানুরাগী ভিক্ষু এবং তীর্থযাত্রীদের কাছে বাংলা অঞ্চল সুবিদিত হয়ে পড়ে।

তখন পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে একমাত্র বাংলা অঞ্চলেই বৌদ্ধ ধর্ম টিকে ছিল। কিন্তু পাল রাজবংশের পতনের কিছুকালের মধ্যেই বাংলার একসময়ের প্রভাবশালী বৌদ্ধ ধর্মের অবসানেরও ঘণ্টা বেজে ওঠে। বাংলা ভূখণ্ডে জনমানসে বৌদ্ধ ধর্মের চর্চা প্রভাব বিলুপ্তির একক কোনো কারণ চিহ্নিত করা দুষ্কর এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঝুঁকিপূর্ণও বটে। পণ্ডিত মহলে এর কারণ নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ তত্ত্ব বিদ্যমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার পতন, বৌদ্ধ ধর্মের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, তান্ত্রিকতা আধিক্য, মঠতন্ত্রের সামাজিক প্রভাব হ্রাস এবং মুসলিমদের আক্রমণ। এর মধ্যে শেষোক্ত তত্ত্বটি আধুনিক ইতিহাসবিদ মহলে সমালোচিত এবং অপেক্ষাকৃত কম গ্রহণযোগ্য।

বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব হ্রাস এবং একপর্যায়ে জনসমাজ থেকে বৌদ্ধ ধর্মচর্চা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হারিয়ে যাওয়া কোনো একক কারণ নয়, বরং একগুচ্ছ জটিল কারণের সমষ্টি। এটি কোনো আকস্মিক বা দৈবাৎ ঘটনা নয়, দীর্ঘ ঐতিহাসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং রূপান্তরের ফল। তথাপি কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে বৌদ্ধ পৃষ্ঠপোষক সর্বশেষ রাজবংশ হিসেবে পাল বংশের পতনের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট শূন্যতা বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ক্রমবিলুপ্তির প্রধান কারণ।

বাংলা ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটেছিল রাজা বিম্বিসার, অশোক, কণিষ্ক, হর্ষবর্ধন এবং পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতা বহু বিত্তশালী ব্যক্তির সহায়তায়। কিন্তু পাল বংশের পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম আর কোনো উল্লেখযোগ্য রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেনি। তাই . অনুকূলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, . পিসি বাগচী, . বিএন চৌধুরী, নীহাররঞ্জন রায়, . দীপককুমার বড়ুয়া, মমতাজুর রহমান তরফদার, কে ভট্টশালী প্রমুখ পণ্ডিত ইতিহাসবিদ মনে করেন, রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহারই ছিল বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব লোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

একসময় বাংলা, বিহার, উত্তর প্রদেশ উড়িষ্যার কিছু অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত পাল সাম্রাজ্য (আনু. ৭৫০-১১৬১ সা. অব্দ) ছিল পূর্ব ভারতের শেষ বৃহৎ সাম্রাজ্য, যা বৌদ্ধ ধর্মের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা করত। অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা বহিরাগত আক্রমণের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের ধ্বংস কেবল রাজনৈতিক রূপান্তর কিংবা কোনো একটি বংশের পতনই সংঘটিত করেনি, বরং বাংলা ভূখণ্ডে বৌদ্ধ শিক্ষা ধর্মীয় কাঠামোর দ্রুত বিলুপ্তির পথকেও প্রশস্ত করেছিল। ধর্মপাল দেবপালের মতো শক্তিশালী শাসকদের পরবর্তী পাল রাজারা ক্রমে দুর্বল অদক্ষতার পরিচয় দেন। তাদের পক্ষে বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে ওঠে। স্থানীয় রাজা সামন্তরা নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করতে থাকেন, যার দরুন প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। উত্তরাধিকার নিয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ব রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরো কয়েক গুণ তীব্রতর করে। এর ফলে পাল আমলের শেষ দিকে রাজস্ব কমে যায় এবং বৌদ্ধবিহার শিক্ষা কেন্দ্রগুলোয় অনুদান সরবরাহ ব্যাহত হয়।

অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দশম শতাব্দী থেকে পাল রাজ্যে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন রাজবংশের আক্রমণ শুরু হয়। পশ্চিম ভারতের প্রতিহাররা এবং দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূটরা পালদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালায়। চন্দেলা কলচুরি রাজারা পাল ভূখণ্ডে আক্রমণ চালায়। পরিস্থিতিতে পালদের অধীন একজন সামন্ত রাজা বিজয় সেন কর্তৃক সেন রাজবংশের উত্থান সম্পূর্ণভাবে বাংলা থেকে পাল শাসনের অবসানকে নির্দেশ করে। দাক্ষিণাত্য থেকে আগত সেনরা ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রবল সমর্থক, ব্রাহ্মণ্য সমাজ ব্যবস্থার প্রবক্তা এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ বা উদাসীন। বাংলায় তারা বর্ণভিত্তিক সামাজিক কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করেন। হিন্দু মন্দির ব্রাহ্মণদের এককভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। এমনকি বৌদ্ধবিহারগুলো দখল করে ব্রাহ্মণ্য উপাসনালয়ে রূপান্তরেরও তথ্য মেলে। এতে ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পর্যায়ে বৌদ্ধ ধর্মের অবমূল্যায়ন ঘটে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রভাব ফেলে।

ট্রেভর লিং বলেন, ব্রাহ্মণরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অংশীদার বাড়াতে চায়নি এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবেও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অংশীজন করতে অনিচ্ছুক ছিল। সেই সময়ে ব্রাহ্মণ্য রাজারা সংঘকে সম্মান প্রভাবের স্থান থেকে সরিয়ে দেয়াকে নিজেদের লক্ষ্য করে তোলে। ফলস্বরূপ সংঘ যেসব পৃষ্ঠপোষকতা দীর্ঘকাল পেয়ে আসছিল তা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। উল্লেখ্য, তৎকালীন বৌদ্ধবিহারগুলো শুধু ভিক্ষুদের আবাসস্থলই ছিল না, বরং জ্ঞান শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। স্বাভাবিকভাবেই ধরনের প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য রাজকীয় সহায়তা অত্যন্ত জরুরি ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক সহায়তা না পাওয়ায় সংঘের সদস্যরা কঠিন জীবনযাত্রার মুখোমুখি হন, যা একসময় বৌদ্ধ ভিক্ষুজীবনকে অসম্ভব করে তোলে। বিপরীতে রাজপৃষ্ঠপোষকতা অনুকম্পার ফলে শৈব, বৈষ্ণব বৈদিক-পৌরাণিক আচারের পুনর্জাগরণ ঘটে, যা সাধারণ জনগণের মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলে। ফলস্বরূপ পাল শাসনের চার শতকের বৌদ্ধ প্রভাব ব্রাহ্মণ্য রাজাদের প্রতিকূলতা নির্যাতনের কারণে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে যায়। প্রসঙ্গে আরসি মজুমদার এবং উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মত প্রকাশ করেছেন যে তৎকালীন রাজপৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে উৎসাহিত ব্রাহ্মণ্য ধর্ম সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ বৌদ্ধ ধর্মকে ইতিহাসের গহ্বরে ঠেলে দেয়। তাই রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে বৌদ্ধ ধর্মের অনুপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পরিগণিত করা যায়। অধিকন্তু পালদের পতনের পর ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী সেন রাজারা বৌদ্ধজীবনের অস্তিত্বের প্রতি এক ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ান। কেননা তারা পাল শাসনামলের সামাজিক উদারনীতিকে বজায় রাখতে আগ্রহী ছিলেন না। পরিবর্তে তারা এমন এক সমাজ ব্যবস্থা গঠন করেন যেখানে জাতিভেদ প্রথাকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে অনুসরণ রক্ষা করা হতো। জাতিভেদ প্রথায় বৌদ্ধদের সমাজের নীচু স্থানে রাখা হয়, ফলে তাদেরকে দারিদ্র্য নিপীড়নের মধ্যে জীবনযাপন করতে হয়। এর পেছনে সক্রিয় শক্তি ছিল উচ্চবর্ণের সমর্থনপুষ্ট রাজপৃষ্ঠপোষকতা। ফলে বৌদ্ধরা আর্থিকভাবে গভীর সংকটে পড়ে।

গবেষক সারিতা ক্ষেত্রী বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কাল ধরেছেন একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী এবং এর প্রধান কারণ হিসেবে পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের একচেটিয়া অগ্রাধিকার এবং ব্রাহ্মণদের নেতৃত্বে পরিচালিত পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থার সঙ্গে বৌদ্ধদের দূরত্বকে চিহ্নিত করেছেন। পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ব্রাহ্মণরা স্ব-অঞ্চলে সব বর্ণের মানুষের কাছে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় থাকতেন। ব্রাহ্মণরা অনেক ক্ষেত্রে কৃষির প্রয়োজনে বসতি অঞ্চলের পুনর্গঠন করতেন। এদিক থেকে বৌদ্ধ মঠগুলোর কর্মকাণ্ড ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণভাবে বৌদ্ধবিহার মঠগুলো এমন জায়গায় গড়ে উঠত যেখানে একটি স্থিতিশীল কৃষিভিত্তিক সমাজ কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বিদ্যমান। ধর্মীয় আদর্শগত দিক থেকে ভিক্ষুরা কঠোর সাধনা এবং কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে জীবন যাপন করতেন এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মুষ্টি দান গ্রহণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফলে ব্রাহ্মণদের ন্যায় কৃষিভিত্তিক পরিবর্তন এবং তার জন্য বসতিবিন্যাসের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে বৌদ্ধ মঠগুলোর সামাজিক ভূমিকা সংকুচিত হয়ে যায় এবং এটি ক্রমাগতভাবে বৌদ্ধ ধর্মের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

পাল সাম্রাজ্যের পতন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয়, এটি ছিল বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলে চূড়ান্ত ধাক্কা। পাল রাজাদের শাসনামলে বৌদ্ধ ধর্ম ছিল সমৃদ্ধ প্রভাবশালী। তাদের পতনের ফলে বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিক রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নতুন রাজবংশের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি একক পক্ষপাতিত্বের কারণে বৌদ্ধ ধর্ম মূলধারার বাইরে চলে যায়।

গ্রন্থপঞ্জি

. সারিতা ক্ষেত্রী, ‘বৌদ্ধ ধর্ম, বাংলাদেশের ইতিহাস: আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল মমিন চৌধুরী সম্পা., (ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০১৯), পৃ. ২৬৩-২৭৬।

. A. M. Chowdhury, Dynastic History of Bengal, Dacca, 1967.

. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস: আদি পর্ব, ষষ্ঠ সংস্করণ, বাংলা ১৪১৪, দে পাবলিশিং, কলকাতা।

. Debiprasad Chattopadhyaya (ed.). History and Society: Essays in Honour of Professor Niharranjan Ray, K P Baghchi & Company, 1978, .Calcutta.

আবু তাইয়্যেব: প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সহিংসতার নতুন উচ্চতা / মব হত্যা দ্বিগুণ, অজ্ঞাত লাশ বেড়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন তীব্র

জঙ্গি সংগঠনগুলোর ন্যারেটিভ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তির আহ্বান ও শ্বাশত মুজিব’

সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে ‘বীর’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’

ফরিদপুর স্টেডিয়াম বধ্যভূমি

ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য / রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

পবিপ্রবির ‘মুক্ত বাংলা’: উপকূলীয় জনপদে স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

১০

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারী ও তাদের বিলাতযাত্রা

১১

নির্বাচনের মাঠে ধর্মের কার্ড: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

১২

নারী ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ আশঙ্কাজনক: মাহদী আমিন

১৩

সরকারের কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা / অর্থাভাবে বন্ধ হতে পারে বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

১৪

নয়া প্ল্যাটফর্ম নয়, পুরানো ভণ্ডামির নতুন দোকান

১৫

ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ হোক

১৬

জামায়াতে ইসলামী অনুতপ্ত নয় একাত্তরের জন্য ক্ষমা চায়নি

১৭

নিজে নিজে না নিভলে নেভে না যে আগুন

১৮

বৈষম্যের অভিশাপ / নতুন প্রজন্ম কি কেবলই একটি ‘বন্দি’ প্রজন্ম?

১৯

ঋণের বোঝায় বাড়ছে আত্মহত্যা: অর্থনৈতিক সংকটের ছায়ায় এক চলমান মানবিক বিপর্যয়

২০