

বাংলার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রজা কর্তৃক শাসক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পাল বংশের ৪০০ বছরের সুদীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়। এ রকম ঘটনা ভারতবর্ষের ইতিহাসেই বিরল। বাংলার প্রজারা স্বেচ্ছায় যাকে সিংহাসনে বসিয়েছিল তার নাম গোপাল দেব। বলা যায় তিনিই বাংলার প্রথম নির্বাচিত শাসক এবং পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত ও কমৌলী তাম্রশাসন মতে পালদের পিতৃভূমি বরেন্দ্রী, যা আজকের রাজশাহী-রংপুর।
পাল বংশের শাসকরা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। তাই পরবর্তী ৪০০ বছর এ বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মচর্চায় তেমন কোনো বিঘ্ন ঘটেনি বলা যায়। বরং ৪০০ বছর ধরে এ বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম হয়ে ওঠে একটি শক্তিশালী ধর্ম। গড়ে ওঠে বেশকিছু বিখ্যাত মহাবিহার, বছরের পর বছর ধরে যা ছিল জ্ঞানচর্চার তীর্থ ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় অবস্থিত সোমপুর মহাবিহারের নির্মাণকাজ সম্ভবত ধর্মপালের রাজত্বের শেষভাগে শুরু হয়, যা তার পুত্র দেবপাল সম্পন্ন করেন। এসব মহাবিহার আসলে ছিল এক একটি বিশ্ববিদ্যালয়। বিদেশী ছাত্র তো বটেই, বিভিন্ন দেশের শাসকরা পাল যুগে নির্মিত এসব স্থাপনার নির্মাণশৈলীতে দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাই মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সোমপুর মহাবিহারের আদলে গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধবিহার। পাল সম্রাট দেবপালের সময় নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্জাগরণ হয়।
পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার বহু আগেই বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের একটি শক্ত ভিত গড়ে ওঠে। সাঁচী বৌদ্ধ স্তূপে প্রাপ্ত খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর একটি শিলালিপিতে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের উপস্থিতির কথা জানা যায়। অন্ধ্র প্রদেশে প্রাপ্ত খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর অন্য একটি শিলালিপিতেও বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাংয়ের মতো আরো অনেক চৈনিক পরিব্রাজক ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্ণনায় বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের চর্চার ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে বলা যায়, এ বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম তার স্বর্ণ যুগ পার করছিল পাল শাসনামলে এবং সেটা ছিল বৌদ্ধ ধর্মের মহাযানপন্থীদের যুগ।
বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি পাল শাসকদের কোনো বিদ্বেষ ছিল না। বৌদ্ধ মহাবিহারগুলোয় ব্রাহ্মণ্য ও জৈন ধর্ম নিয়েও পাঠদান চলত। সমাজেও বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সহাবস্থান ছিল।
পাল শাসকরা ছিলেন মহাযানপন্থী বৌদ্ধ। তাদের শাসনকালেই পূর্ব ভারতে মহাযান ধর্ম ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। তিব্বতি সূত্র ধরে জানা যায়, খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মগধ ও তিব্বতের মহাযান পন্থা বাঙালি ধর্মীয় গুরুদের মাধ্যমে চট্টগ্রামে প্রচার হয়। সেই সময় চট্টগ্রামেও মহাযানপন্থী বৌদ্ধবিহার গড়ে ওঠে। খ্রিস্টীয় নবম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত বহু মহাযানী বৌদ্ধমূর্তি চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মহাযানী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে অবলোকিতেশ্বর, পদ্মপানি, মঞ্জুশ্রী, লোকনাথ, মৈত্রেয় মূর্তির সংখ্যা বেশি। চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধারকৃত এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করে Dr. N N Law লিখেছেন, All that images are undoubtedly reminiscent of a Mahayanic religious wave that passed over Chittagong eight or nine centuries ago.
এখানে যে মহাযানপন্থী প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে, তা মূলত পাল রাজত্বের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণেই হয়েছিল। যদিও চট্টগ্রাম পালদের অধীনে ছিল না, তার পরও এ শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ঢেউ চট্টগ্রামেও আছড়ে পড়ে।
আনুমানিক দশম শতাব্দী পর্যন্ত আরাকান ও চট্টগ্রামে মহাযান মত চালু ছিল। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় যে ধরনের বৌদ্ধ ধর্ম চর্চা হয় তা হলো থেরবাদ। এটা সম্ভব হয়েছে পগাঁর (Pagan empire of Burma) রাজা আনোরহতার রাজত্বকালে। রাজা আনোরহতা (Anawratha, 1044-77 AD) সমগ্র বার্মাকে এক পতাকায় নিয়ে আসেন। তার রাজত্বকালে ভিক্ষু শিন অরহন গুরুবাদী বৌদ্ধতান্ত্রিক মহাযান ‘আরি’ (Ari) মতবাদ উচ্ছেদ করে হীনযান বা থেরবাদ প্রবর্তন করেন। আনোরহতা আরাকান ও চট্টগ্রামেও থেরবাদ মতবাদ চালু করেন। তখনো কিন্তু বাংলার অন্য অংশে পাল বংশ রাজত্ব করছিল এবং মহাযান প্রথা চালু ছিল। অবশ্য ১৮৭০-এর দশকে আরাকান থেকে সংঘরাজ সারমেধ মহাথেরো চট্টগ্রামে এসে বৌদ্ধ ধর্মের থেরবাদ প্রচার করতে থাকেন। এর ফলে চট্টগ্রামে বৌদ্ধ সমাজে মহাযান ধর্মের প্রভাব হ্রাস পায়।
নাথ মতবাদ বৌদ্ধতান্ত্রিক মতবাদকে আরো একটি নতুন রূপ দান করেছিল। এ মতবাদ হলো বৌদ্ধতান্ত্রিক মতবাদ ও শৈবমতের মিশ্রণ। নাথ মতাবলম্বীরা বিশ্বাস করে যে আদিনাথ বা আদিবুদ্ধ তাদের প্রধান দেবতা। কক্সবাজার জেলার মহেশখালী দ্বীপ হচ্ছে আদিনাথের প্রথম এবং প্রধান পূজাস্থল। এ দ্বীপের পর্বত শীর্ষে আদিনাথ মন্দির এখনো হিন্দুদের একটি প্রধান তীর্থস্থান। আবার এ আদিনাথ মন্দিরের পাশেই অন্য একটি উঁচু পাহাড়ে আরাকানিজ-বার্মিজ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত প্রাচীন বৌদ্ধ প্যাগোডা বা চৈত্য রয়েছে, যা হয়তো রাজা আনোরহতা কর্তৃক চট্টগ্রামে মহাযান হটিয়ে থেরবাদ মতবাদ চালুর প্রতীকী রূপ।
ইতিহাসবিদ সুনীতিভূষণ কানুনগো মনে করেন, বাংলা ও বিহারে বৌদ্ধধর্মের পতনের একাধিক কারণ রয়েছে। যদিও লামা তারনাথের মতে, তুর্কি মুসলমানদের আক্রমণের ফলে বাংলা ও বিহার প্রদেশ থেকে বৌদ্ধ ধর্ম বিলুপ্ত হয়েছিল। কিন্তু সুনীতিভূষণ কানুনগোর মতে, এটি একমাত্র কারণ নয়। তিনি তার বই ‘চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস’-এ লিখছেন, ‘রামাইয়াৎ নামে একটি চরমপন্থী সন্ন্যাসী সম্প্রদায় বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে।’
পাল যুগের শেষের দিকে এবং পাল রাজত্বের অবসানের পর মহাযান বৌদ্ধ ধর্মে হিন্দুতান্ত্রিক মতবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে। কালক্রমে হিন্দুতান্ত্রিক মতবাদের সঙ্গে বৌদ্ধ মহাযান মতবাদ মিলেমিশে এমন গভীর হয় যে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করাটাই কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মের বিলুপ্তির এটাও একটা বড় কারণ। যে গৌতম বুদ্ধ নিজেকে কখনো ঈশ্বর বলে দাবি করেননি, তাকেই কিনা ঈশ্বর বানিয়ে দেয়া হলো! সঙ্গে যোগ হলো হিন্দু ধর্মের মা কালীর মহাযানী রূপ তারা, ধনের দেবী বসুধাসহ (লক্ষ্মী) আরো অনেক দেবদেবী। বৌদ্ধ ধর্ম তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে ঠিক এ জায়গায়। বৌদ্ধ ধর্ম আসলে তার মূল বৈশিষ্ট্য তথা শীল ও বিনয়—এ দুটি থেকে সরে গিয়েছিল। তার জায়গায় উপস্থিত হয় বিভিন্ন দেবদেবী এবং তা বেশি দেখা যায় মহাযান মতবাদে।
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তার ‘বৌদ্ধধর্ম’ গ্রন্থে লিখছেন, ‘বৌদ্ধদের প্রধান শত্রু রাজারাও ছিলেন না, ব্রাহ্মণরাও ছিলেন না, শৈব-যোগীরাই উহাদের প্রধান শত্রু ছিল। তিনি ‘Antiquities of the Tantras and the Introduction of Tantric rites in Buddhism’ প্রবন্ধে লিখেছেন, কীভাবে ত্রিরত্নের ‘বুদ্ধ’, ‘ধর্ম’ ও ‘সংঘ’-কে বিকৃত করা হয়েছে। তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মকে স্ত্রীরূপ প্রজ্ঞা দেয়া হয়েছে এবং সংঘকে বোধিসত্ত্ব। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখছেন, This identification introduced a female deity into the Buddhist Trinity and she at once became the mother of all Bodhisattvas, beings representing the Sangha or the Buddhist congregation. In the Durbar library belonging to the Kalacakra School I subsequently saw illustrations of Buddha and Prajna in the unspeakable situation begetting Bodhisattvas....Buddhism subsequently became closely allied to Sakti worship and its latter development ran in parallel lines that of Sakti cult.
মহাযান মতবাদের বিবর্তন বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের বিলুপ্তির অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এটা নিশ্চিত যে পাল শাসনামলে খ্রিস্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মকে তান্ত্রিক ধ্যানধারণা স্পর্শ করে। এর ফলে খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দীতে মহাযানে গুহ্য সাধনতত্ত্বের রীতি চালু হয়। এ রীতি সম্পর্কে নীহাররঞ্জন রায় বলেন, ‘এই গুহ্য সাধনার ধ্যান-কল্পনা কোথা হইতে কী করিয়া মহাযান দেহে প্রবেশ করিয়া বৌদ্ধ ধর্মের রূপান্তর ঘটাইল এবং বিভিন্ন ধারার সৃষ্টি করিল, বলা কঠিন। মহাযানের মধ্যে তাহার বীজ সুপ্ত ছিল কিনা তাহাও নিঃসংশয়ে বলা যায় না’। এ গুহ্যপূজা যে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের অবক্ষয় ঘটিয়েছিল তা মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর লেখা পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন। বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃতির এটাও অন্যতম কারণ, যার শেষ পরিণতি হয় বিলুপ্তির মাধ্যমে।
এটা স্পষ্ট যে পাল আমলে বৌদ্ধ ধর্ম রাজধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও সমাজে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রসার থেমে ছিল না। রাষ্ট্র পরিচালনায় পাল শাসকরা বরাবরই ধর্মীয় উদার নীতি মেনে চলেন। পাল বংশের প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই রাজদরবারে প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্রাহ্মণরা নিয়োগ পেতেন। এ বংশের শাসনামলের শেষের দিকে বৌদ্ধ ধর্ম তার মূলনীতি থেকে অনেকটাই সরে আসে। পাল রাজাদের উদারনীতির কারণে এক ধরনের মিশ্র সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়েছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীকে বৌদ্ধরা স্বীকার করে নিয়েছিল এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্ম খোদ বুদ্ধকে তাদের দেবতা রূপে গ্রহণ করেছিল। যার প্রমাণ সোমপুর বৌদ্ধ মহাবিহারের বিভিন্ন টেরাকোটার চিত্রে ফুটে উঠেছে। এসব কারণে পাল আমলের শেষের দিকে বাংলায় বৌদ্ধরা ধীরে ধীরে অন্য ধর্মের মাঝে হারিয়ে যেতে শুরু করে।
অনেক ইতিহাসবেত্তা অবশ্য মনে করেন, পাল আমলে রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং সমাজ ব্যবস্থায় বৌদ্ধ ধর্ম ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মধ্যে ভারসাম্য নীতি সেন বংশের বিজয় সেন ত্যাগ করেন। তার শাসনামলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম রাষ্ট্র পরিচালনায় একক অগ্রাধিকার পেয়েছিল। এর ফলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম তার গুরুত্ব হারাতে থাকে। তবে এটাও ঠিক যে সেন বংশের বিজয় সেন ক্ষমতায় আসার আগেই বর্মণ রাজারা ব্রাহ্মণ্য ধর্মকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিপক্ষ বানিয়ে দেয়। বর্মণ রাজা শ্যামল বর্মণ ভারতের নানা জায়গা থেকে কুলীন ব্রাহ্মণ এনে বাংলায় বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেয়। বর্মণ ও সেন বংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্ম তার রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে ফেলে। পাল যুগে বৌদ্ধ ধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ব্রাহ্মণ্য ধর্মসহ অন্যান্য ধর্ম রাজকীয় দান অহরহ পেয়েছে। পাল আমলের বহু লিপিতে তার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু সেন ও বর্মণ যুগে বৌদ্ধ ধর্মের রাজকীয় দান পাওয়ার প্রমাণ সেই তুলনায় বিরল। বরং বহু বৌদ্ধবিহারে হিন্দু দেবদেবী তাদের স্থান পাকাপোক্ত করে নেয়। এমনকি বৌদ্ধদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মহাবিহার হিন্দুদের দখলে চলে যায়। মহাবোধি প্রাঙ্গণে এখনো শিবের মূর্তি রয়েছে। সোমপুর বৌদ্ধবিহার খননের সময় অনেক হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে। যদিও পালদের আমলে নির্মিত এ মহাবিহারে মহাযান মতবাদের বেশকিছু মূর্তি আগে থেকেই ছিল, যাতে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব স্পষ্ট। পাল-উত্তর যুগে বাংলাদেশের অনেক জায়গায় বুদ্ধের ধ্যানমগ্ন বুদ্ধকে জৈন ধর্মের মহাবীর বলে চালিয়ে দেয়া হয়। বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে আতঙ্কিত ছিল। বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের বিনাশ করার আহ্বান দেখা যায় শূন্যপুরাণে। তবে কিছু ব্যতিক্রমও ছিল। সেন বংশের রাজা লক্ষ্মণ সেন বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি কিছুটা উদারতা দেখিয়েছিলেন। তার সভাকবি জয়দেব প্রাণী হত্যা বা যজ্ঞের নিন্দা করায় বুদ্ধের প্রশংসা করেছেন। যদিও সেই প্রশংসায় বুদ্ধকে অবতার হিসেবে দেখানো হয়েছে।
বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ওপর সর্বশেষ বড় আঘাতটি আসে তুর্কি আক্রমণের মাধ্যমে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন, ১১৬০-৬২ খ্রিস্টাব্দে বল্লাল সেনের বাহিনী পাল বংশের শেষ সামন্ত রাজা গোবিন্দপালকে পরাজিত করে পাল রাজত্বের অবসান ঘটান। কিন্তু ইতিহাসবিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ঐতিহাসিক প্রমাণাদির ওপর ভিত্তি করে এ বক্তব্য নাকচ করে দেন। তার মতে, ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজি মগধ জয় করে ওদন্তপুর মহাবিহার ধ্বংস করেন। তবকাৎ-ই-নাসিরিতে উল্লেখ আছে, মগধ জয়ের সময় বাংলার অন্য কোনো রাজা গোবিন্দপালকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেননি। সামান্য সৈন্য নিয়ে গোবিন্দপাল যুদ্ধে হেরে নিহত হন। এভাবেই ধর্মপাল ও দেবপালের হাতে গড়া ৪০০ বছরের বিশাল পাল সাম্রাজ্যের শেষ প্রদীপটিও নিভে যায়।
মগধে যখন মহাবিহারগুলো ধ্বংস হচ্ছিল, তখন বাংলার মহাবিহারের ভিক্ষুরা আতঙ্কিত হয়ে মূল্যবান কিছু গ্রন্থ নিয়ে কেউ কেউ নেপাল ও তিব্বতে চলে যান, আবার কেউ কেউ গেলেন সিংহল ও আরাকানে। বাংলার বৌদ্ধবিহারগুলো সংঘহীন হয়ে পড়ল। বিহারের প্রাণ সংঘই যদি না থাকে, তবে ধর্ম টিকে থাকার সম্ভাবনাও লুপ্ত হয়।
একটা সময় তুর্কিরা বাংলায়ও প্রবেশ করে এবং অনেক বৌদ্ধ সেই সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তাদের মধ্যে আগের বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কিছুটা হলেও রয়ে যায়। তুর্কিদের শাসন বাংলার হিন্দু ধর্ম সামাল দিতে পারলে বৌদ্ধরা কেন পারল না? আসলে বাংলাসহ ভারতের অন্যান্য জায়গায় বৌদ্ধ ধর্ম যখন ছিল তখন ছিল মূলত বিহারকেন্দ্রিক। অনেক বিহার ধ্বংস হওয়ায় সেই ক্ষতি সামাল দেয়ার মতো শক্তি বৌদ্ধদের ছিল না। কেননা পাল রাজত্বের শেষের দিকে এবং বর্মণ ও সেন আমলেই বৌদ্ধ ধর্মের পতন শুরু হয়ে গিয়েছিল।
তুর্কি আগমনের পর চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে বৌদ্ধদের প্রাণকেন্দ্র। মূলত আরাকান ঘনিষ্ঠতায় সেটা সম্ভব হয়েছিল। ১৮৭০-এর দশকে সারমেধ মহাথেরো চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সমাজে থেরবাদ মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। ধীরে ধীরে মহাযান মতবাদের প্রভাব হ্রাস পেতে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামই বেশি সংখ্যক বৌদ্ধদের আবাসস্থল। ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পুনর্জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ কৃপাশরণ মহাস্থবির এ চট্টগ্রামেরই সন্তান। তিনি ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার উনাইনপুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে তিনি কলকাতায় বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা প্রতিষ্ঠা করেন। ভারতের সংবিধানপ্রণেতা ড. আম্বেদকারকে কয়েক লাখ অনুসারীসহ বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা দেয়া বৌদ্ধ ভিক্ষু উ চন্দ্রমনি তার ভিক্ষু জীবন বা উপসম্পাদা লাভ করেন কক্সবাজারের রামুতে। এটা বলাই যায় যে পাল-উত্তর যুগে বাংলাদেশের বৌদ্ধ ধর্ম এখনো চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে।
সহায়ক গ্রন্থ
১. বন্দ্যোপাধ্যায়, রাখাল দাস, বাঙ্গালার ইতিহাস, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় খণ্ড।
২. রায়, নীহাররঞ্জন, বাঙালির ইতিহাস, আদিপর্ব, দ্বিতীয় খণ্ড।
৩. কানুনগো, সুনীতিভূষণ, চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাস, বাতিঘর সংস্করণ।
৪. শাস্ত্রী, হরপ্রসাদ, বৌদ্ধধর্ম।
৫. শরীফ, আহমদ, চট্টগ্রামের ইতিহাস।
৬. শাহরিয়ার, খন্দকার স্বনন, প্রাচীন যুগের বাংলা, গঙ্গারাজ্য থেকে গৌড়।
৭. দাশগুপ্ত, বিপ্লব, বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষা, প্রাক্-ঔপনিবেশিক পর্ব।
৮. বড়ুয়া, প্রণব কুমার, বাংলাদেশের বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতি।
৯. বড়ুয়া, শিরুপন, খিজারী, এক দানবীরের অপ্রকাশিত ইতিহাস।
১০. Sarkar, Jadunath, India Through The Ages.
১১. Murshid, Ghulam, Bengali Culture, Over Thousand Years.
১২. Cleary, Thomas, The Secrets of Tantrik Buddhism, Understanding the Ecstasy of Enlightenment.
শিরুপন বড়ুয়া: রামু: ইতিহাস প্রেক্ষাপট জনশ্রুতি গ্রন্থের লেখক।
মন্তব্য করুন