ঢাকা সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
ইতিহাসে পালাবদল

বাংলায় পাল রাজ্য থেকে সেন শাসন

রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ইতিহাসের চিরায়ত অনুষঙ্গ।
ড. শহিদুল হাসান
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
দিবর দিঘি ও কৈবর্ত স্তম্ভ, পত্নীতলা, নওগাঁ |

সাধারণ অব্দের সপ্তম শতাব্দীতে প্রথম চার দশকে উত্তর ভারতের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে বাংলার অভ্যুদয় ঘটে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সমস্যা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বারংবার আক্রমণের কারণে পরের প্রায় ১০০ বছর (সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীর মধ্যাবধি) বাংলায় নৈরাজ্য চলতে থাকে। এরপর গোপাল নামক একজন শাসকের আবির্ভাব ঘটলে দেশে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। গোপাল ছিলেন পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পাল শাসক বংশ প্রায় চতুর্থ শতাব্দীকাল বাংলা বিহার শাসন করে। (চৌধুরী, ২০২০, পৃষ্ঠা ৬৪৭)

উপর্যুক্ত উদ্ধৃতিটি আমার পিএইচডি সুপারভাইজার প্রয়াত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী রচিত পাল রাজ্য: আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয় গ্রন্থ অধ্যায়ের প্রথম অনুচ্ছেদ। কিন্তু অনুচ্ছেদ শিরোনামটি মাৎসন্যায়ম পাল রাজবংশের উত্থান বর্তমান লেখার মূল বিষয়ক্ষমতার পালাবদল। বাংলায় শত বছরের অরাজকতা বা মাৎস্যন্যায়ম অবসান ঘটিয়ে পাল রাজারা ক্ষমতায় এসেছিলেন। প্রাচীন ভারতীয় রাজনীতিবিজ্ঞ চাণক্য তার অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে মাৎস্যন্যায়ম-এর সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে বলেছেন

অপ্রণিতস্তু মাৎস্যন্যায়ম উদ্ভাবয়তি/ বলীয়ান-অবলম হিগ্রসতে দণ্ডধরাভাবে (অনুবাদ: দণ্ডের বিধান স্থগিত রাখা হলে, মাছদের অবস্থা নিয়ে যা নিহিত সে রকম অর্থ্যাৎ বড় মাছ ছোটকে গিলে খায় সে রকম অবস্থা দেখা দেয়। শাসকের উপস্থিতি না থাকলে সবল দুর্বলকে গ্রাস করবে)

রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ইতিহাসের চিরায়ত অনুষঙ্গ। তবে বাংলার ইতিহাসে অষ্টম-দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত কালপর্বটি পাল রাজাদের আধিপত্য, সুশাসন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বাংলার রাজনৈতিক আধিপত্যের ইতিহাস। সে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বর্তমান লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং পালদের ক্ষমতা অবসানের পর সেনদের উত্থানের প্রক্রিয়া তুলে ধরাই আজকের লেখার মূল বিষয়। চতুর্থ শতাব্দীকাল শাসন চালানো পাল বংশের শেষ রাজা মদনপাল (আনু. ১১৪৩/৪৪-১১৬৫/৬৬) এবং আরো ১৭ জন পাল রাজা বাংলার সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়েছিলেন। দশম একাদশ শতাব্দীতে বাংলায় কম্বোজ গৌড়পতিদের অস্তিত্ব পাল বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল কিনা? প্রশ্নটি ইতিহাসবিদদের আলোচনায় নানাভাবে এসেছে। কিন্তু একাদশ শতাব্দীর কৈবর্ত্য বিদ্রোহও যে পাল শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল, বিষয়টি ইতিহাসবিদদের গবেষণায় ফুটে উঠেছে। রাজা রামপাল (আনু. ১০৯০-১১৪৩ সা. অব্দ) ১৪ জন সামন্তের সামরিক সহযোগিতায় কৈবর্ত্য বিদ্রোহী দিব্যকের পুত্র ভীমকে পরাজিত করেছিলেন। কবি সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতম কাব্যে ১৪ জন সামন্তের তালিকা পাওয়া যায়। তালিকার দ্বাদশ নামটি হলো নিদ্রাবলীর বিজয়রাজ। সামন্তের পরিচয় নিয়ে অধিকাংশের মতামত তিনি সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন।

বাংলায় সেন রাজবংশের উত্থানের ইতিহাস অনুযায়ী, দাক্ষিণাত্য থেকে আগত সেন রাজারা নিজেদের কর্ণাটক থেকে আগত ব্রাহ্মণ হিসেবে পরিচয় দেন এবং তারা পরবর্তী সময়ে ক্ষত্রিয় হিসেবে পেশা গ্রহণ করেন। পরিবারটি শুরুতে বাংলার পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ রাঢ় এলাকায় বসবাস শুরু করে। প্রস্তাব অনুসারে, নিদ্রাবলী রাঢ় এলাকার অন্তর্গত। এর সমর্থন মেলে বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে। সেখানে বলা হয়, বল্লাল সেনের পূর্বপুরুষরা প্রথমে রাঢ় দেশে বসতি স্থাপন করে। রামচরিতমের প্রস্তাব অনুসরণ করলে সেন রাজারা ছিলেন পাল রাজাদের সামরিক শক্তির অংশ এবং তারা পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী হয়ে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল। সেন রাজবংশের রাজ্য বিজয়ের বিবরণ অনুযায়ী বিজয় সেন সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বাংলার প্রধান তিনটি উপাঞ্চল বঙ্গ-রাঢ়-বরেন্দ্র এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের ভাষায়:

এভাবে রাঢ়কে কেন্দ্র করে বিজয় সেন ক্রমেই শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন এবং দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ তিনি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বর্মাদের উৎখাত করার মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। অবশ্য বর্মাদের রাজধানী দখল করার আগেই বিজয় সেন পালদের উৎখাত করেছিলেন কিনা তা বলার মতো কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই। কলিঙ্গ কামরূপের বিরুদ্ধে পরিচালিত নৌ অভিযানটি শক্তি বৃদ্ধির জন্য নয় বরং এটি ছিল তার শক্তির প্রদর্শনী মাত্র। বাংলার সব উপাঞ্চলগুলোর ওপর বিজয় সেন তার বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সমগ্র বাংলা জয় করে নিজ পরিবারের শ্রেষ্ঠত্বের বুনিয়াদ স্থাপন করেছিলেন (চৌধুরী মিশ্র, ২০২০, পৃষ্ঠা ৭৮০)

বল্লাল সেনের নৈহাটি তাম্রশাসনের বিজয় সেনকে সমগ্র পৃথিবীর অধিপতি (অখিল পার্থিবচক্রবর্তী) হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রশংসা করা হয়েছে নির্ভ্যাজ-বিক্রম তিরস্কৃত সাহসাঙ্কঃ [অনুবাদ: তিনি তার ক্ষমতার নিখুঁত প্রকাশে সাহসাঙ্ক বা বিক্রমাদিত্যের মহিমাকে ছাড়িয়ে গেছেন (চৌধুরী মিশ্র, ২০২০, পৃষ্ঠা ৭৮০-৮২)] পরবর্তী সেন রাজা বিশেষত বিশ্বরূপ সেন কেশব সেনের একাধিক তাম্রশাসনে বিজয় সেনের সামরিক শক্তির প্রশংসা করা হয়েছে।

পাল রাজাদের হাত থেকে ক্ষমতার স্থানান্তর সেন রাজাদের নিকটেই হয়েছিল। কিন্তু সে প্রক্রিয়ার বিশদ তথ্য আমাদের হাতে নেই। তবে এটি নিশ্চিত সেন রাজাদের মাৎস্যন্যায়ম-এর মতো কোনো অরাজক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি। সম্ভবত বিজয় সেনের সামরিক দক্ষতা রাজনৈতিক পালাবদলকে করেছিল মসৃণ। তবে তা হঠাৎ করে হয়নি এবং একসঙ্গে সমগ্র বাংলাজুড়ে হয়নি।

কেন পাল কাঠামোর অংশ হয়েও সেন রাজারা পরবর্তী সময়ে তাদের হটিয়ে দিলেন? প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে মান্যবর রণবীর চক্রবর্তীর রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা শিরোনামা গ্রন্থ অধ্যায়ে। এখানে অধ্যাপক চক্রবর্তী পাল শাসনের থাকে থাকে সাজানো প্রশাসন ব্যবস্থার বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন। অধ্যাপক চক্রবর্তী লেখেন, থাকে থাকে সাজানো রাজতান্ত্রিক কাঠামোর চরিত্রটি সবচেয়ে প্রকট হয় লেখমালায় উল্লিখিত বিভিন্ন পর্যায়ের সামন্ত মহাসামন্তদের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমে। সামন্ত এবং মহাসামন্ত পর্যায়ের অধীনস্থ শাসকরা কি আঞ্চলিক শক্তি, কি স্থানীয় শক্তি, উভয় ক্ষেত্রেই বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা সুযোগ সুবিধা বুঝে স্বাতন্ত্র্য ঘোষণাতে পিছপা হতেন না। তাম্রশাসনে যখন মহাসামন্ত বা সামন্তদের পরিচয় দেওয়া হয়, তখন তাঁরা কোনও বৃহত্তর এবং অধিকতর ক্ষমতাবান অধিপতির আনুগত্য মানছেন, এমন আভাসই লিপিবদ্ধ থাকে। বাংলার লেখগুলি সামন্ত মহাসামন্তদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে বীরত্বের যে ফলাও বর্ণনা দেয়, তা থেকে মনে করা স্বাভাবিক যে, তাঁরা উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তির অধিকারী ছিলেন। (চক্রবতী, ২০২০, পৃষ্ঠা, ৮২৮।

ওপরের আলোচনায় রাষ্ট্র কাঠামোয় সামরিক শক্তি হিসেবে সামন্তদের অপরিহার্যতা স্পষ্ট। বাংলার পাল রাজাদের সামরিক শক্তির উৎস হিসেবে থাকা গোষ্ঠীদের মধ্যে সেন বংশীয় শাসকরা একসময় সমগ্র বাংলায় তাদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেন। ক্ষমতার পালাবদল কখনো হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। যেমনটা হয়েছিল মাৎস্যন্যায়ম-এর পর। চার শতকের পাল শাসন বয়ে এনেছিল নানা সুফল। সম্ভবত তাদের পতনের পর মাৎস্যন্যায়ম-এর মতো কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি এবং সেন রাজারাও পালাবদলের সংকটের সম্মুখীন হয়নি। নিরেট সূত্রের আলোকে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেয়া কষ্টকর। তবে পূর্বাপর সূত্রগুলোকে বিশ্লেষণ করে সমাপ্তি মন্তব্য করা যেতে পারে যে সম্ভবত নিদ্রাবলীর বিজয় সেনের সামরিক দক্ষতা পালাবদলকে করেছিল গতিময় শঙ্কামুক্ত।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

. চৌধুরী, আবদুল মমিন (সম্পাদিত),

বাংলাদেশের ইতিহাস আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিতে আদি বাংলা (আনু. ১২০০ সা. অব্দ) প্রথম খণ্ড, প্রত্নতত্ত্ব রাজনৈতিক ইতিহাস রাষ্ট্রগঠন, ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ২০২০।

. চৌধুরী, আবদুল মমিন পাল রাজ্য:

আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির অভ্যুদয়, আবদুল মমিন চৌধুরী (সম্পাদিত), প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬৪৫-৭৭২।

. চৌধুরী, আবদুল মমিন এবং চিত্তরঞ্জন মিশ্র, ‘‌ সেন রাজবংশের শাসন: সংহতির পথে বাংলার উপাঞ্চলসমূহ, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৭৩-৭৯৪।

. চক্রবর্তী, রণবীর, রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৭৯৫-৮৪৪।

. Abdul Momin Chowdhury, Dynastic History of Bengal (c. 750-1200 A.D.), Dacca: The Asiatic Society of Pakistan, 1967.

. শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সহিংসতার নতুন উচ্চতা / মব হত্যা দ্বিগুণ, অজ্ঞাত লাশ বেড়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন তীব্র

জঙ্গি সংগঠনগুলোর ন্যারেটিভ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তির আহ্বান ও শ্বাশত মুজিব’

সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে ‘বীর’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’

ফরিদপুর স্টেডিয়াম বধ্যভূমি

ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য / রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

পবিপ্রবির ‘মুক্ত বাংলা’: উপকূলীয় জনপদে স্বাধীনতার অবিনাশী প্রতীক

কারাগারের গেটে স্ত্রী-সন্তানের লাশ: একটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনের চিত্র

১০

ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালি নারী ও তাদের বিলাতযাত্রা

১১

নির্বাচনের মাঠে ধর্মের কার্ড: গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

১২

নারী ভোটারদের এনআইডি কপি ও বিকাশ নম্বর সংগ্রহ আশঙ্কাজনক: মাহদী আমিন

১৩

সরকারের কাছে পাওনা ৪ হাজার কোটি টাকা / অর্থাভাবে বন্ধ হতে পারে বাঁশখালী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র

১৪

নয়া প্ল্যাটফর্ম নয়, পুরানো ভণ্ডামির নতুন দোকান

১৫

ধর্ষকের সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের উদ্যোগ বন্ধ হোক

১৬

জামায়াতে ইসলামী অনুতপ্ত নয় একাত্তরের জন্য ক্ষমা চায়নি

১৭

নিজে নিজে না নিভলে নেভে না যে আগুন

১৮

বৈষম্যের অভিশাপ / নতুন প্রজন্ম কি কেবলই একটি ‘বন্দি’ প্রজন্ম?

১৯

ঋণের বোঝায় বাড়ছে আত্মহত্যা: অর্থনৈতিক সংকটের ছায়ায় এক চলমান মানবিক বিপর্যয়

২০