ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

আবিউর রহমান: অপারেশন জ্যাকপটের অকুতোভয় নৌ-কমান্ডো

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম
১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১২ পিএম
অকুতোভয় নৌ-কমান্ডো বীর মুক্তিযোদ্ধা আবিউর রহমান | ছবি:

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস মূলত সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। তেমনই এক অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবিউর রহমান। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে জীবন বাজি রেখে তিনি অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও প্রভাববিস্তারী নৌ-অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপটে’।

প্রারম্ভিক জীবন ও ৭ মার্চের চেতনা

আবিউর রহমান ১৯৫৫ সালের ২২ মে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গার শিবচরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে জীবনের নানা চড়াই-উৎরাইয়ে পরবর্তীকালে তিনি রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পিতৃহীন তরুণ আবিউর রহমান চরম আর্থিক অনটনের সম্মুখীন হন। জীবিকা ও শিক্ষার তাগিদে তিনি চট্টগ্রামের বাড়বকুণ্ডে মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং স্থানীয় একটি কেমিক্যাল কারখানায় কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি কারখানার অন্যান্য শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংক রোড অবরোধের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

ভারতে গমন ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণ

২৫ মার্চের নারকীয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পর মামাবাড়ির সবাইকে হারিয়ে একা হয়ে পড়েন তরুণ আবিউর। কিন্তু দমে না গিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কুমিল্লার লাকসাম হয়ে ২৯ মার্চ ভারতের সাতবাড়িয়া সীমান্ত পার হওয়ার সময় বিএসএফের হাতে আটক হন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে তাঁকে আগরতলা ও পরে আসামের কাঁঠালিয়া রিফিউজি ক্যাম্পে পাঠানো হয়।

২৮ এপ্রিল ‘কাদের’ নামের এক ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অঙ্গীকার করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে:

  • আখাউড়া ও কুমিল্লার মতিনগর ক্যাম্পে তাঁদের গ্রেনেড ছোঁড়ার মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
  • পরবর্তীতে গারো পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে উচ্চতর শারীরিক ও যুদ্ধকৌশল প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।

পলাশী সি-সেক্টর: কঠিন কমান্ডো ট্রেনিং

আবিউর রহমানের শারীরিক সক্ষমতা ও ক্ষিপ্রতা দেখে ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁকে একদল চৌকস তরুণের সঙ্গে বাছাই করে মুর্শিদাবাদের ঐতিহাসিক পলাশীর ভাগ্যকূল নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (সি-সেক্টর) পাঠায়।

ক্যাপ্টেন সমীর দাস ও ভারতীয় নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ ইন্সট্রাক্টরদের অধীনে তাঁদের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে গোপন কমান্ডো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণের মূল ভিত্তি ছিল:

  • দীর্ঘ সময় পানির নিচে শ্বাস ধরে রাখা।
  • সাতার কেটে নিঃশব্দে শত্রুপক্ষের জাহাজের তলদেশে পৌঁছানো।
  • লাইমপেট মাইন (Limpet Mine) জাহাজের গায়ে যুক্ত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসা।

‘অপারেশন জ্যাকপট’ ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ধ্বংসযজ্ঞ

প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭১ সালের আগস্টের শুরুতে ঐতিহাসিক ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর রূপরেখা তৈরি হয়।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: সামরিক অভিযান বা ‘অপারেশন জ্যাকপট’ ছিল বহির্বিশ্বকে দেখিয়ে দেওয়া যে, বাংলাদেশে কোনো গৃহযুদ্ধ চলছে না, বরং এটি একটি সুসংগঠিত মুক্তিযুদ্ধ। একযোগে চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে পাকিস্তানি সামরিক ও রসদবাহী জাহাজ ধ্বংস করাই ছিল এই অভিযানের লক্ষ্য।

  • যাত্রা শুরু: ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট ভারতীয় হাসনাবাদ সীমান্ত অতিক্রম করে সুন্দরবনের গহিন পথ ধরে কুশখালী ক্যাম্পে পৌঁছায় কমান্ডো দলটি।
  • অভিযান: লেফটেন্যান্ট কর্নেল বদি আলমের (পরবর্তীতে বীর উত্তম) নেতৃত্বে মোংলা বন্দরে নোঙ্গর করা বিদেশি ও পাকিস্তানি সহযোগী জাহাজগুলোতে হামলার সিদ্ধান্ত হয়।
  • চূড়ান্ত প্রহার: ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে (১৪ আগস্ট দিবাগত রাত) জীবন বিপন্ন করে উত্তাল সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়েন আবিউর রহমান ও তাঁর সহযোদ্ধারা। সাঁতরে গিয়ে মাইন সেট করার পর একের পর এক বিকট বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে মোংলা বন্দর। এ অভিযানে শত্রু ও বিদেশি সহযোগীদের অন্তত ৬টি জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যা পাকিস্তানি সামরিক সক্ষমতার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

বিজয় ও পরবর্তী জীবন

অভিযান সফল করার পর কমান্ডারদের নির্দেশে এই বীর কমান্ডোরা সুন্দরবন অঞ্চলেই অবস্থান নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হলে আবিউর রহমান নিজ গ্রামে ফিরে আসেন এবং অসুস্থ মাকে জড়িয়ে ধরে বিজয়ের আনন্দ ভাগ করে নেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবিউর রহমানের জীবনের শেষ ইচ্ছা—বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যেন কোনোদিন মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ ও অবদানকে ভুলে না যায়।

তথ্যসূত্র

  • সাংবাদিক অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই (রাঙামাটি)
  • সাংবাদিক ফজলে এলাহী, সম্পাদক পাহার২৪.কম
অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০