
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কিন্তু ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চের স্মৃতিবাহী এই ২০২৬ সালের মার্চে এসে দেশের এই প্রধান শিল্প খাতটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এক ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। নিচে এই সংকটের প্রধান দিকগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
১. পরিবহন খরচ ও লিড-টাইম বিপর্যয়
ইসরায়েলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলা এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ হয়ে ওঠায় বৈশ্বিক নৌ-রুটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
রুট পরিবর্তন: ইউরোপ ও আমেরিকাগামী জাহাজগুলোকে এখন সুয়েজ খাল এড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে যাতায়াত সময় অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন বেড়ে গেছে।
ভাড়া বৃদ্ধি: কন্টেইনার শিপিং চার্জ ইতিমধ্যে ৩০০% বেড়ে গেছে। শিপিং কোম্পানিগুলো ‘ওয়ার রিস্ক সারচার্জ’ আরোপ করায় একটি টি-শার্টের উৎপাদন খরচের চেয়ে তার পরিবহন খরচ এখন বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে চাহিদাহ্রাস
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
মুদ্রাস্ফীতি: বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৪৫ ডলার ছাড়ানোয় পশ্চিমের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ওয়ালমার্ট, এইচঅ্যান্ডএম বা জারা-র মতো বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে তাদের অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছে।
অর্ডার বাতিল: অনেক ক্রেতা ইতিমধ্যে ‘ফোর্স মেজার’ (অনিবার্য পরিস্থিতি) ক্লজ দেখিয়ে বিদ্যমান অর্ডারগুলো স্থগিত বা বাতিল করতে শুরু করেছে।
৩. কাঁচামাল আমদানিতে সংকট
পোশাক তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ডাইস, কেমিক্যাল এবং অনেক ক্ষেত্রে ফেব্রিক্স চীন বা ইউরোপ থেকে আসে।
সাপ্লাই চেইন বিচ্ছিন্ন: সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় কাঁচামাল সময়মতো বন্দরে পৌঁছাচ্ছে না। এর ফলে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে ‘ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’ খোলা এবং সময়মতো উৎপাদন সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
উৎপাদন খরচ: স্থানীয়ভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ায় কারখানার পরিচালনা ব্যয় (Overhead Cost) ২০-২৫% বেড়ে গেছে।
৪. এয়ার ফ্রেইটের ওপর অতিরিক্ত চাপ
সমুদ্রপথ বন্ধ থাকায় অনেক জরুরি অর্ডার পাঠাতে উদ্যোক্তারা আকাশপথ বা এয়ার ফ্রেইট ব্যবহার করছেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ায় বিমান ভাড়াও এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলার পর আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলো ঢাকা থেকে কার্গো বুকিং নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
৫. ব্যাংকিং ও এলসি জটিলতা
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় রপ্তানি বিল সংগ্রহে দেরি হচ্ছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের বেতন ও বোনাস পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। যদি যুদ্ধ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়ায় (যেমনটি ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে), তবে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
উত্তরণের পথ কী?
বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-র সূত্রমতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
বিকল্প রুট: চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি ভারতের ওপর দিয়ে বা অন্য কোনো নিরাপদ ট্রানজিট ব্যবহার করে রপ্তানি সচল রাখা।
প্রণোদনা: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় পোশাক খাতের জন্য বিশেষ ভর্তুকি প্রদান।
নতুন বাজার: যুদ্ধ কবলিত অঞ্চল এড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজারগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নে মার্চ মাস যেমন ছিল অগ্নিঝরা, ২০২৬ সালের এই মার্চও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যের রণাঙ্গনে ট্রাম্পের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঘোষণা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন